ঢাকার রুটি
সুবহে কাযেবের' আভাস দৃশ্যমান হওয়া শুরু হয়েছে আর দেখুন রুটি বিক্রেতারা তন্দুরে আগুন জ্বেলে দিয়েছে এবং অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হওয়া শুরু করেছে। ঢাকায় পূর্বে ঘরে ঘরে ঘড়ি ছিল না। এজন্য চক থেকে দুধ এবং দুধের সর বিক্রেতাদের দোকান উঠে যাওয়া রাত বারোটা বাজার সুনির্দিষ্ট চিহ্ন মনে করা হতো এবং ভোর হবার নিশ্চিত পরিচয় ছিল তন্দুরের অগ্নি প্রজ্বলন। শীত হোক অথবা বর্ষা, এই দুই পেশার লোকেরা নিজেদের অভ্যাসে এত দৃঢ় এবং মজবুত ছিল যে তাদের কার্যকলাপ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতো। সমগ্র বাংলার মধ্যে ঢাকার এই আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং যদিও বাংলার সাধারণ খাদ্য চাউল অর্থাৎ ভাত, কিন্তু ঢাকায় সাধারণভাবে বাজারসমূহে এত ধরনের রুটি পাওয়া যায় যে, যে সমস্ত দেশে রুটিই শুধুমাত্র খাওয়া হয়ে থাকে সেখানেও এত প্রাচুর্য এবং বিভিন্নতা নেই। আবার প্রত্যেক রুটি স্বীয় ইতিহাস এবং বংশ পরিচয়সহ বিদ্যমান। আমি আজ এদের মধ্য থেকে কয়েকটির বর্ণনা দেবো কিন্তু তার মধ্যে একটিও এমন হবে না যে, যা বাজারে সাধারণভাবে বিক্রি না হয় অন্যথায় বাড়িতে তৈরি রুটি যা এখন পর্যন্ত বেপর্দা হয়ে বাজারে আসেনি তার বিবরণের জন্য একটি স্বতন্ত্র নিবন্ধের প্রয়োজন।
যে সব বন্ধুগণ এতদসম্পর্কিত প্রথম বিষয়টি শ্রবণ করেছেন তাদের কাছে এটি পরিষ্কার হয়েছে যে, ঢাকার শহুরে বাসিন্দারা প্রকৃতপক্ষে রুটি খেতে অভ্যস্ত এবং দুই/তিনশ' বৎসর সময়ে তাদেরকে শুধুমাত্র এতটুকু পরিবর্তন করেছে যে, তারা শুধুমাত্র দুপুরে ভাত খাওয়া শুরু করেছে। আমি চোখ মেলেই এই দেখেছি যে, সমগ্র ঢাকা সকালে নাস্তায় বাকরখানি খাচ্ছে। কিন্তু ঢাকার সঙ্গে যার প্রসিদ্ধি খুবই সম্পৃক্ত এই বাকরখানি জিনিসটি কি? এবং তা কিভাবে তৈরি হয়? আপনাদের সর্বপ্রথম এটা জানা থাকা প্রয়োজন যে, ঢাকার শীরমাল এবং বাকরখানি দু'টিই পৃথক পৃথক রুটি এবং লক্ষ্ণৌর মতো দুই নামের একই জিনিস নয় বরং রং, আকৃতি এবং স্বাদেও পরস্পরের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। স্মরণযোগ্য যে, তন্দুর মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুস্থানে এবং তাদের মাধ্যমে সমগ্র প্রদেশে পৌঁছেছে এবং এখানে যেসব মুসলমান প্রথমত আসেন তারা জাতে তুর্কী এবং আফগানী ছিলেন। এজন্য তাদের সঙ্গে প্রথমদিকে যে মুসলিম রুটি এখানে পরিচিতি লাভকরে তা ছিল এই নানরুটি, যা আজও সমগ্র আফগানিস্তান বরং উত্তর ভরতের সমগ্র শহরে সাধারণভাবে বিক্রি হয় এবং খাদ্য হিসাবে ও হজমের দিক থেকে এটি সবচেয়ে উত্তম মনে করা হয়। বাংলায় যতদূর জানা যায় কলকাতা ছাড়া শুধুমাত্র ঢাকাতেই নানরুটি তৈরি হয় এবং বাজারে বিক্রি হয়। আমি আমার বাল্যকালে দুই পেশোয়ারী, রজমান খান এবং নূরুল্লাহ খানকে এবং যৌবনে ইউপির বাসিন্দা রুস্তম নামক নান বিক্রেতাদের দেখেছি, যারা নান রুটি তৈরি করত এবং স্থানীয় আফগানী ও পেশোয়ারীরা তাদের কাছ থেকে রুটি কিন্ত। কিন্তু ঐ সাদা রুটির খরিদ্দার ঢাকাবাসীদের মধ্যে বেশি ছিল না। অতঃপর বহুদিন পর্যন্ত ঢাকা নানরুটি মুক্ত থাকে। এই রুটিকে এখানে আবীরুটি বলে। বর্তমানে কয়েক বছর থেকে বাজারে 'নিহারী' এসেছে, যে কারণে পুনরায় নানরুটির প্রচলন হয়েছে।
পাঠানদের পর এখানে মোগলদের আগমন ঘটে এবং তারা নিজেদের সঙ্গে 'শীরমাল' নিয়ে আসে। এই শীরমাল ঐ সময়ে সুজি দিয়ে তৈরি হতো কিন্তু আমি আমার বাল্যকালে দেখেছি যে, বিশেষ ফরমায়েশ অনুযায়ী সুজি দিয়ে বানানো হতো। অন্যথায় সাধারণভাবে ময়দা দিয়ে তৈরি হতো। প্রথমত কিছু ময়দার সঙ্গে মাওয়া মিশানো হতো। অতঃপর কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর ঘি এবং বাকি ময়দা একসঙ্গে শক্ত হাতে মিশান হতো। অতঃপর দুধ দিয়ে ঐ ময়দা ছানা হতো কেননা আসল শীরমালে পানির প্রবেশাধিকার ছিল না। অতঃপর কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পছন্দমত পরিমাণের রুটি বানানো হতো এবং
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments